কহিনুর বেগম, পটুয়াখালী : পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ৭নং বগা ইউনিয়নের চাবুয়া সড়কের পাশে নদী ও কৃষিজমির মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বিশাল স্তূপ। কোথাও মাটি কেটে নিচু করা হয়েছে জমি, কোথাও সেই মাটি স্তূপ করে তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের মতো উঁচু ঢিবি। কাটা হয়েছে গাছপালাও। এর পাশেই বসানো হয়েছে তিনটি চুল্লি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব চুল্লিতে পাথর পোড়ানো হচ্ছে কাঠ জ্বালিয়ে। চুল্লি জ্বললেই বের হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বসতবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চুল্লিগুলোর পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ কাঠ। চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চুল্লির ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কেউ কেউ চোখ-মুখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি, অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এভাবে ধোঁয়া ছড়াতে থাকলে এর প্রভাব পড়বে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যের ওপর।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ার মাত্রা, বায়ুদূষণের পরিমাণ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
চাবুয়া সড়কের পাশে চুল্লিগুলোর আশপাশে মাটির বড় বড় স্তূপ দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নদী ও নদীসংলগ্ন এলাকা এবং কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে এসব স্তূপ তৈরি করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এই মাটি কাটার অনুমতি রয়েছে কি না। কোথা থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়েছে, কত পরিমাণ মাটি কাটা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জমির মালিক বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তারও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটি কাটার পাশাপাশি ওই এলাকায় গাছপালাও কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে একদিকে কৃষিজমি ও নদীর তীরের ভূমির পরিবর্তন ঘটছে, অন্যদিকে কমছে সবুজ আচ্ছাদন।
পরিবেশ ও ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত ছাড়া এসব কর্মকাণ্ড বৈধ কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ এবং সরেজমিনে দৃশ্যমান মাটির স্তূপ ও গাছ কাটার চিহ্ন বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
এক পাশে চুল্লি, অন্য পাশে বিদ্যালয় চুল্লিগুলোর আশপাশে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাসরাবাদ চাবুয়া সালিয়া আলিম মাদ্রাসা, সাবুয়া দ্বীনিয়া মাদ্রাসা, চাবুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কায়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাওরাভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানাজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বামনিকাঠি কেসিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বামনিকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে শত শত শিক্ষার্থী। ফলে চুল্লির ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা।
একাধিক বাসিন্দা বলেন, চুল্লি চালু থাকলে বাতাসে ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস কম থাকলে ধোঁয়া দীর্ঘ সময় ধরে আশপাশে অবস্থান করে। এতে বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “চুল্লি জ্বললে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করেও ধোঁয়া থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছি।”
ছাড়পত্র আছে, নাকি শুধু আবেদন?
চুল্লিগুলোর কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পরিবেশগত অনুমোদন নিয়ে।
সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিবেশগত ছাড়পত্রের কপি বা কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি। তবে কারখানার মালিক ইকবাল মাহমুদ দাবি করেছেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা এবং ছাড়পত্র পাওয়া কি একই বিষয়?
পরিবেশগত অনুমোদনের ক্ষেত্রে আবেদন করা, যাচাই-বাছাই এবং অনুমোদন পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করে দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠানটি আদৌ পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে কি না, পেলে কোন শ্রেণিতে পেয়েছে এবং কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কোন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমোদনের আবেদন করেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাথর পোড়ানোর কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পরিবেশগত ও অন্যান্য আইন-কানুন কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি ও কার্যক্রমের ওপর।
চুল্লির পাশে রাখা কাঠের স্তূপ স্থানীয়দের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। তাঁদের দাবি, কাঠ পুড়িয়ে চুল্লি চালানো হচ্ছে।
সরেজমিনে চুল্লির পাশে কাঠ মজুত থাকতে দেখা গেছে। তবে কাঠগুলো ঠিক কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্রতিদিন কী পরিমাণ কাঠ পোড়ানো হয়, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
যদি সত্যিই কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই কাঠের উৎস কী এবং তা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
‘শিল্প দরকার, পরিবেশ ধ্বংস করে নয়’
বগা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবুল মৃধা বলেন, এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য শিল্পকারখানা প্রয়োজন। তবে তা অবশ্যই পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি না করে পরিচালনা করতে হবে।
তিনি বলেন, “শিল্পকারখানা হোক, মানুষের কর্মসংস্থান হোক। কিন্তু এর জন্য নদী, কৃষিজমি ও পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না।”
বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুর রউফ বলেন, কালো ধোঁয়ার কারণে বাতাসের মান খারাপ হলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা তৈরি বা বাড়তে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে চিকিৎসকের এই সতর্কতার মিল থাকলেও, বগার চুল্লিগুলোর কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো রোগ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা বেড়েছে, তা জানতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরিবেশগত বায়ুমান পরীক্ষা প্রয়োজন।
বিষয়টি নিয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। অনুমোদন না থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল বলেন, বিষয়টি তাঁর নজরে নেই। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন।
এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে
চাবুয়ার এই স্থাপনাকে ঘিরে একসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে- নদী ও কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা হয়েছে কি না, মাটি কাটার অনুমোদন আছে কি না, গাছপালা কাটার ঘটনা ঘটেছে কি না, তিনটি চুল্লি পরিচালনার বৈধতা কী, পরিবেশগত ছাড়পত্র আদৌ পাওয়া গেছে কি না এবং কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের বৈধতা রয়েছে কি না।
এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এত কাছে চুল্লিগুলোর অবস্থান পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ।
শুধু মালিকপক্ষের কাগজপত্র যাচাই করলেই এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে না। প্রয়োজন সরেজমিন তদন্ত, পরিবেশগত পরিমাপ এবং মাটি সংগ্রহের উৎস যাচাই।
প্রশাসন ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছে। এখন অপেক্ষা, সেই কাগজপত্রে কী আছে এবং মাঠপর্যায়ের তদন্তে কী বেরিয়ে আসে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি যেন শুধু নোটিশ ও আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নদী, কৃষিজমি, গাছপালা, পরিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি বৈধ শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করা হোক। তারা বলছেন- শিল্প চাই, কর্মসংস্থানও চাই। তবে উন্নয়নের নামে নদী, কৃষিজমি ও মানুষের স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে নয়।
Leave a Reply