কামরুল হাসান, কোটালীপাড়া : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পুর্ণবতী ও কুরপালা গ্রামের মাঝে সরকারি দুটি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে খাল দখল করে পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ জমিতে মাছের ঘের তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি খলিল দাড়িয়ার বিরুদ্ধে।খাল দুটি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি বের হতে না পারায় এলাকার অর্ধতাধিক পরিবার ভোগান্তিতে পড়েছে।বৃষ্টি হলেই অনেকের বাড়িঘরে পানি উঠে যায়। বন্ধ হয়ে গেছে খালে নৌকা চলাচল। সামনে বোরো মৌসুমে কৃষকেরা সেচসুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।সরেজমিনে গিয়ে
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুর্ণবতীও কুরপালা গ্রামের মাঝে সরকারি দুটি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে বিশাল আকৃতির মৎস্য ঘের’ তৈরি করা হয়েছে। গত জুনে খাল দুটির মুখে বাঁধ দেওয়ার পর থেকেই স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এই ঘেরের ভেতরে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বসতবাড়ি করে বসবাস করছেন কৃষক আকবর শিকদার।তার বসত বাড়ি-ঘরের চারপাশে এখন থৈ থৈ করছে মাছের ঘেরের পানি। পানির ঢেউয়ে বাড়ির চারপাশের মাটি ভেঙে যাচ্ছে। যেকোনো সময় বসতবাড়িটি ভেঙে ঘেরের পানিতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।ভুক্তভোগী আকবর শিকদারের স্ত্রী রোজিনা বেগম কান্না জরিত কন্ঠে বলেন মৎস্য ঘেরের কারণে আমাদের বাড়িঘর গাছপালা ভেঙে যাচ্ছে। মৎস্য ঘের মালিকদের বার বার বলা হলেও আমাদের বাড়িঘর রক্ষার্থে কোন ব্যবস্হা না নেওয়ায় নিরুপায় হয়ে আমার স্বামী কোটালীপাড়া ও গোপালগঞ্জ অফিসে আবেদন নিবেদন করেছেন।কিন্তু তারাও কোন পদক্ষেপ নেয়নি।এখন আমরা আমাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবো।
আকবর শিকদারের অভিযোগ, বাড়ির চারপাশে ভাঙন ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঘের পরিচালনাকারীদের বারবার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।পরে তিনি প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেও কার্যকর কোনো প্রতিকার না পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে চরম হতাশার ভুগছেন।
আকবর শিকদার বলেন, “চারপাশে পানি আর পানি। ঢেউয়ের কারণে বাড়ির মাটি ভেঙে গাছপালা পড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এভাবে চলতে থাকলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
পুর্ণবতী ও কুরপালা খাল দুটি স্থানীয় ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের জন্য জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের বিভিন্ন সময়ে তাঁরা এই খাল থেকে মাছ ধরে সংসার চালাতেন। কিন্তু খাল দখল করে মাছের ঘের তৈরির পর তাঁরা খালে আগের মতো মাছ ধরতে পারছেন না।
মৎস্যজীবী কাজী হাচান ও মকিত শেখ,বলেন, “আমাদের কোনো ঘের নেই। খাল-বিল থেকে মাছ ধরে সংসার চালাই।তাদের দাবি সরকারি খাল দুটি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে গোখাদ্য সংগ্রহে সংকট দেখা দিয়াছে।তারা বলেন এভাবে বছরের পর বছর খাল দুটি যদি বন্ধ থাকে তাহলে আমরা মাছ ধরব কোথায়? ঘের করা হয়েছে, মাছ হচ্ছে—কিন্তু আমরা যারা খালের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কথা কেউ ভাবছে না।”স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, খালের মুখে বাঁধ দেওয়ায় শুধু মৎস্যজীবীরাই নয়, কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বর্ষায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বোরো মৌসুমে খালের পানি সেচকাজে ব্যবহার করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মৎস্যঘের পরিচালনাকারী খলিল দাড়িয়া বলেন, “এলাকাবাসী সবাই মিলে মাছের ঘের করেছে এবং আমাকে ঘেরটি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।”
খালের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘেরের ভেতরে দুটি খাল রয়েছে এবং ওই খাল দুটিতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, “এভাবে খালে বাঁধ দেওয়া ঠিক হয়নি। তবে এলাকাবাসী সবাই মিলে বাঁধ দিয়েছে, তাই আমার কিছু করার নেই।”
খলিল দাড়িয়া আরও বলেন, শুধু এই ঘেরেই খাল দখল করে মাছ চাষ করা হচ্ছে এমন নয়; কোটালীপাড়ার আরও অনেক খাল দখল করে মাছের ঘের করা হয়েছে।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, তিনি সদ্য কোটালীপাড়া উপজেলায় যোগ দিয়েছেন। খাল দখল করে মাছের ঘের নির্মাণের বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
তিনি বলেন, “সরকারি খাল বা জলাশয় কারও দখলে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের কোনো বিষয় প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাছের ঘেরের কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্হানে বানা জাল ও মাটি দ্বারা সরকারি খাল আটকে মাছ চাষ করার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের মাছ চাষের স্বার্থে একটি খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ করতে পারেন কি না। আর খালটি যদি সরকারি জলাশয় বা জনসাধারণের ব্যবহারের জলপথ হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সেটি কীভাবে দখল বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকল, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
Leave a Reply