কামরুল হাসান, কোটালীপাড়া : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বহলতলী গ্রামে স্থানীয় সালিশদের উদ্যোগে চুরি যাওয়া একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় দুই ভাই শাওন শিকদার ও অমিত শিকদারের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক কেনাবেচা ও সেবনসহ বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাওন শিকদার।
শুক্রবার রাতে পর্যন্ত বহলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের তিন রাস্তার মোড়ে এ সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এলাকার মুরুব্বি মো. মাহাবুব শিকদার এবং পরিচালনা করেন আঃ হাই শিকদার।
সালিসি বৈঠকে মোবাইল চুরির বিষয়টির রহস্য উন্মোচনের পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার সকালে সরেজমিন বহলতলীগ্রামে গেলে মোবাইল চুরি ছাড়াও নানা অনৈতিক কর্মকান্ডের বিষয় সামনে আনেন এলাকাবাসী।
সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের দাবি, গত ৩ আগস্ট রাতে পার্শ্ববর্তী টুঙ্গিপাড়া উপজেলার নুনিয়া গোপালপুর গ্রামের একটি মৎস্য ঘের থেকে রুপাহাটি গ্রামের প্রসেঞ্জিত সেনের রিয়েলমি ব্রান্ডের মোবাইল ফোনটি চুরি হয়। অভিযোগ ওঠে, বহলতলী গ্রামের অমিত শিকদার মোবাইলটি নিয়ে বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার নরসিংহপুর গ্রামের একটি বাড়িতে বিক্রি করতে যান।
সেখানে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে মোবাইলটি আটকে বাবলু শিকদারের কাছে দেওয়া হয়। পরে বাবলু শিকদার মোবাইলটি বহলতলী গ্রামের মুরুব্বিদের কাছে জমা দেন বলে সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান।
এরপর স্থানীয় সালিশরা মোবাইল কেনার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে রিয়লমি ব্রান্ডের মোবাইলটি প্রসেঞ্জিত সেনের বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তা তার অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত স্থানীয়দের বক্তব্যে শাওন শিকদার ও অমিত শিকদারকে ঘিরে অতীতের আরও কয়েকটি ঘটনার অভিযোগ উঠে আসে। স্থানীয়দের দাবি, এর আগে শাওন শিকদার ও তার ভাই অমিত শিকদারের বিরুদ্ধে রিয়াজ শিকদারের মৎস্য ঘের থেকে চিংড়ি মাছ চুরির অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন পিঞ্জুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদ শিকদারের উপস্থিতিতে তাদের বিচার করা হয় বলে দাবি করেন রিয়াজ শিকদার।
রিয়াজ শিকদার বলেন, ২০০৭ সালে শাওন ও অমিত তার ঘের থেকে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের চিংড়ি মাছ চুরি করেন। পরে চেয়ারম্যান মাহমুদ শিকদার ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে তাদের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া স্থানীয়দের দাবি, কিছুদিন আগে বহলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি মোটর চুরির ঘটনায়ও অমিত শিকদারকে ঢাকায় বিক্রির সময় ধরে এনে বিদ্যালয় মাঠে এলাকাবাসীর সামনে বিচার করা হয়। এ বিচার করেছিলেন নাসিরউদ্দিন শিকদার মুক্তা বলে স্থানীয়রা জানান।
নাসিরউদ্দিন শিকদার মুক্তা বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগেও এলাকায় একাধিকবার বিচার হয়েছে।”
সালিশে উপস্থিত কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, শাওন ও অমিত নিয়মিত মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের কর্মকাণ্ডে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো আইনগত নথি বা মামলার তথ্য সালিশে উপস্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে পুলিশের সাবেক এসআই ছবিরউদ্দিন শিকদার অভিযোগ করেন, শাওন শিকদার সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে স্থানীয় নিরীহ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি তাদের পারিবারিক বসতবাড়ির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে সাইবার ক্রাইম আইনে মানহানির মতো অপরাধ করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন শাওন শিকদার। অমিত শিকদারের বিরুদ্ধে মোবাইল চুরির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রসেঞ্জিতের সঙ্গে আমাদের একটা বিষয় ছিল। এই দরবার আমরাই করছিলাম। মোবাইলটা আটকে রেখে দরবার করা হয়েছিল। যাই হোক, তাদের মোবাইল তাদের ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে এটা চুরি নয়, হয়তো কেউ ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে বা বলেছে।”
রিয়াজ শিকদারের ঘের থেকে চিংড়ি মাছ চুরির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শাওন বলেন, “রিয়াজ শিকদারের কাছে জিজ্ঞেস করেন। হয়তো যারা কথিত সালিশ করেছে, তারা বহলতলীতে সালিশ করার মতো লোক কিনা, সেটাই আমার জানা নেই। এটা মিথ্যা ও বানোয়াট। যারা সালিশ করেছে, তারা নিজেরাই বহলতলীর সবচেয়ে বড় অপরাধী।”
অন্যদিকে সালিশ বৈঠকের সভাপতি মাহাবুব শিকদার বলেন, “অমিত শিকদারের বাবা নান্না শিকদার মোবাইলটি ফেরত দিতে বলেছেন। আমরা সালিশরা মোবাইলটির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মালিকের কাছে ফেরত দিয়েছি।”
Leave a Reply