ডেস্ক রিপোর্ট : ১১ দলীয় ঐক্যজোট আয়োজিত ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে। ১১ দলের নেতারা তাদের ঘোষিত ছয় দফা অবিলম্বে বাস্তবায়নে সরকারকে দিয়েছেন সতর্ক বার্তা। এই ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও তিনটি লংমার্চ শেষে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মাধ্যমে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানিয়েছেন নেতারা। তারা সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ছয় দফা বাস্তবায়ন না হলে সেটা এক দফা পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী শান্তিপূর্ণ লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। ওই দিন সকাল ৭টায় ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে শুরু হয় লংমার্চ। পথিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইতে নির্ধারিত পথসভা ছাড়াও কয়েকটি অনির্ধারিত পথসভা শেষে রাত ৯টায় চট্টগ্রামের লালদিঘীতে পৌঁছায় লংমার্চ। সেখানে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয় লংমার্চ।
শাপলা চত্বর থেকে লালদীঘি পর্যন্ত দীর্ঘপথ পরিভ্রম ছিল নজিরবিহীন শৃঙ্খলায় ঘেরা। হাজার হাজার গাড়ি কোথায়ও জটলা হয়নি, তবে রাস্তার দুইধারে লাখো জনতার ভিড় ঠেলে লংমার্চের বহরকে এগোতে হয় ধীরগতিতে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন লংমার্চ দেখার জন্য। তাদের হাতে ছিল লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা, দলীয় পতাকা, দলীয় প্রতীক, লা-ইলাহার পতাকা। এছাড়াও দেখা গেছে ছয় দফার বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন। অনেকের হাতে ছিল ফুল, যা গাড়ির উপর ছিটিয়ে অভিনন্দিত করা হয় লংমার্চকারীদের। তাদের মুখে ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দাবির নানা স্লোগান। ছিল জনগণের নিত্য সমস্যা সমাধানের জন্য বজ্রকণ্ঠের নানা উচ্চারণ।
আয়োজকরা জ্বালানির বিষয়টি মাথায় রেখে যানবাহন সংখ্যা এক হাজারে সীমিত রাখার কথা ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এক হাজারের পরেও বিশেষ অনুরোধে স্টিকার সংখ্যা অফিশিয়ালি ২শ বাড়িয়ে দেওয়া হয় শেষ মুহূর্তে। তবে তাতেও সীমিত থাকেনি। নির্ধারিত গাড়ির বাইরে আরও তিনগুণ গাড়ি যুক্ত হয় লংমার্চ বহরে। ফলে একটি এলাকা অতিক্রম করতে সময় লাগে আধা ঘণ্টারও বেশি।
বড় কর্মসূচিতে খাবার বিতরণ একটি বড় জটিল এবং দায়িত্বপূর্ণ কাজ, যা নিয়ে হয় যত অভিযোগ; কিন্তু ১১ দলের এই দীর্ঘ লংমার্চটি ছিল তার ব্যতিক্রম। সকালের নাস্তা নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা করার ঘোষণা ছিল; কিন্তু দেখা গেল প্রতি গাড়ির দায়িত্বশীলরা আগেই তার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। কোনো গাড়িতে পাউরুটি আর কলা, কোনো গাড়িতে পরাটা ডালভাজি। আবার কোনো কোনো গাড়ির দায়িত্বশীল নেতা বাসা থেকে রুটি, গরুর মাংস, ডালভাজি নিয়ে এসেছেন তার সহযাত্রীদের খাওয়ানোর জন্য। লংমার্চ কুমিল্লা শহরে পোঁছার আগেই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থামিয়ে প্রতিটি গাড়িতে লোকসংখ্যা অনুসারে দুপুরের খাবারের প্যাকেট দিয়ে দেওয়া হয়। খাবার পায়নি- এমন অভিযোগ কারও ছিল না। আবার সন্ধ্যায় লংমার্চ চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছার আগেই শহরের প্রবেশমুখে প্রতিটি গাড়ি থামিয়ে রাতের খাবার দিয়ে দেওয়া হয়। কোথাও ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না কোনো বিশৃঙ্খলার খবর।
ঢাকার শাপলা চত্বর, চট্টগ্রামের লালদিঘী আরও পাঁচটি নির্ধারিত ও দুটি অনির্ধারিত পথসভায় ১১ দলের শীর্ষ নেতারা ছয় দফা দাবির পক্ষে যেমন জোরালো বক্তব্য রেখেছেন তেমনি সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এই ছয় দফা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করুন, অন্যথায় ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে এবং তা সরকারের পতন ডেকে আনবে।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নিজেই এসব দাবির পক্ষে নানা স্লোগান দেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে পর্যন্ত নানা স্লোগান দিতে দেখা যায় সমাবেশ ও পথসভায়।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে। ওয়াদা দিয়ে তা লঙ্ঘন করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই রাস্তায় রক্ত ঢেলেছিলেন আপনাদের সঙ্গীরা। তাদের সেই দাবি পূরণ হয়নি। সেই দাবি পূরণ করার জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি। ইনশাআল্লাহ, দাবি পূরণ করে ঘরে ফিরব।
গণভোটের রায় ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের দাবি তুলে জামায়াত আমির বলেন, আমরা রাস্তায় নেমেছি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার জন্য। রাস্তায় নেমেছি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য। আমরা রাস্তায় নেমেছি আপনাদের ঘরে গ্যাস ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। রাস্তায় নেমেছি আপনাদের ঘরে বিদ্যুৎ ও বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করার জন্য।
তিনি পথসভাগুলোতে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা কি ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান, গ্যাস পান? চাঁদাবাজি হয় কিনা?’ দেশ মাদকে ছেয়ে গেছে কিনা?, মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা?, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না খারাপ?
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন- তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের এসব মৌলিক দাবি পূরণ না হলে সরকার গদিতে থাকতে পারবে না। তিনি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করে বলেন, অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সরকারকে কঠিন পরিণতি বরণ করতে হবে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিদ্যুৎ দে গ্যাস দে- নইলে গদি ছেড়ে দে- এই স্লোগান তার। তিনি এবং তার দলকে এখন এই স্লোগান বাস্তবায়ন করতে হবে।
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন এবং দেশকে সঠিক গন্তব্যে এগিয়ে নিতে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। লংমার্চের মধ্য দিয়ে চলমান আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১১ দলের শীর্ষ নেতাদের এসব উচ্চারণ সরকারকে নতুন সতর্ক বার্তা দিচ্ছে বলে উল্লেখ করছেন অভিজ্ঞ মহল।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া পেয়েছি লংমার্চে। আশা করি, সরকার এ থেকে নতুন বার্তা পেয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে পরিণতি কী হতে পারে সরকার তা বুঝতে সক্ষম হবে। অন্যথা কী হবে সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে।
Leave a Reply