কামরুল হাসান, কোটালীপাড়া : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সম্পত্তির লোভে জীবিত ভাইকে মেরে সকল সম্পত্তি আত্মসাত করার অভিযোগ উঠেছে তার আপন ভাইদের বিরুদ্ধে। সশরীরে আঘাত বা কোন ধরনের অস্ত্রের মাধ্যমে না মেরে কাগজে কলমে তাকে মৃত ঘোষণা করে চিরদিনের জন্য তার সত্য থেকে বঞ্চিত করার মত এমন অমানুষিক ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার রামশীল ইউনিয়নের খাগবাড়ী গ্রামে।
এ ঘটনা জানার পর বিস্মিত হয়েছেন গোটা অঞ্চলের মানুষ।এমন ঘটনায় অপর ভাইদের মনুষ্যত্ব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন এলাকাবাসী।স্থানীয়রা জানান সম্পদের লোভে যারা জীবিত এক মায়ের পেটের আপন ভাইকে মেরে ফেলতে পারে তারা কি মানুষ? এটাতো পশুত্বের আচরণ। তারা সম্পদ লোভী শত্রু এরা কারো ভাই হতে পারে না।
সরেজমিনে গেলে খাগবাড়ী গ্রামের বিরেন জয়ধর বলেন- সচিন্দ্রনাথ জয়ধরের ৪ ছেলে ৪ মেয়ে,তার ৪ ছেলেই জীবিত এর মধ্যে বড় ছেলে সুনীল জয়ধর ভারতে রয়েছে। আরেক প্রতিবেশি সমীর জয়ধর বলেন সঠিক কথা বলতে গেলে তো সত্রু হতে হয়।তার ৪ ছেলে সুনীল, সুবোধ,,সঞ্জয় শ্যামল,সবাই জীবিত আছে এর মধ্যে তো কেউ মারা যায়নি ।
সুনীল জয়ধরের জেঠিমা বলেন, শ্যামল জয়ধররা ৪ ভাই এর মধ্যে সুনীল ভারতে থাকে তার একটা ছেলেও আছে,সেতো জীবিত আছে।
শ্যামল জয়ধরের কাকাতো ভাই ক্ষিতীশ জয়ধর বলেন, সুনীল জয়ধররা ৪ ভাই সবাইতো জীবিত আছে এর মধ্যে বড় ভাই সুনীল জয়ধর মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে এবং ফোন করে কথা বলেন।
এছাড়াও ওই এলাকার আরো একাধিক নারী পুরুষ বলেন, সচিন্দ্রনাথ জয়ধরের ৪ ছেলে এবং সবাই জীবিত আছে। এর মধ্যে সুনীল জয়ধর ও সঞ্জয় জয়ধর ভারতে রয়েছে। কিন্তু এতোদিনে বিষয়টি বুঝতে পারিনাই। এখন জানতে পারলাম যে তাদের বড় ভাই সুনীল জয়ধরকে মেরে পিতৃ পরিচয় থেকে বঞ্চিত করে তার অংশের জায়গা জমি সব নিজেদের নামে নিয়ে অন্যত্রে বিক্রি করেছে।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্যামল জয়ধর একটা কলেজের একজন প্রফেসর হয়ে কি ভাবে এমন জঘন্য কাজটা করলেন।জীবিত ব্যক্তিকে মৃত্যু বানানোর অপরাধে শ্যামল জয়ধারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীও জানিয়েছেন তারা।
সম্পদের নথিপত্র থেকে জানাগেছে খাগবাড়ী গ্রামের রতিকান্ত জয়ধরের ছেলে সচিন্দ্রনাথ জয়ধর ৬০ নং রামশীল-খাগবাড়ী মৌজার বিআর এস ৩৫৯ নং খতিয়ানে ৪৬০.০০একর। বিআর এস ৬৭৯ খতিয়ানে ৮৬.০৫ শতাংশ।বিআর এস ৬৭৮ নং খতিয়ানে ২০.০০শতাংশ। বিআর এস ৩৬২ নং খতিয়ানে ০৩.৫০ শতাংশ। বিআর এস ৩৬০ নং খতিয়ানে ০২.২৫ শতাংশ একুনে ৫৭২.২৫ একর সম্পত্তির মালিক থাকেন।
তিনি মৃত্যকালেঃ- ৪ পুত্র সুনীল জয়ধর সুবোধ জয়ধর,সঞ্জয় জয়ধর ও শ্যামল জয়ধরকে রেখে যান।এরপর তার রেখে যাওয়া ৫৭২.২৫ একর সম্পত্তি পৈত্রিক ওয়ারিশ হিসেবে ৪ ছেলে প্রত্যেকে সমান ভাগে ১৪৩.০০ একর ভুমি প্রাপ্ত হন।
অপরদিকে সুনীল জয়ধর ভারতে যান এবং সেখান থেকে তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পরিবার নিয়ে অবস্থান করছেন।
এদিকে বড় ভাই সুনীল জয়ধর বিদেশে থাকায় তার অপর তিন ভাই সুবোধ জয়ধর, সঞ্চয় জয়ধর,ও শ্যামল জয়ধর মিলে পরিকল্পিত ভাবে তার বড় ভাই সুনীল জয়ধরের ১৪৩, ০০ একর সম্পত্তির লোভে জীবিত ৪ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সুনীল জয়ধরকে মৃত বলে রামশীল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শ্যামল কান্তি বিশ্বাস স্বক্ষরিত একটা ওয়ারিশ সনদ দিয়ে তার পিতৃ পরিচয় চিরদনের জন্য মুছে ফেলে তার সম্পত্তি গ্রাস করে।এরপর সুবোধ জয়ধর,সঞ্জয় জয়ধর ও শ্যামল জয়ধর পর্যায়ক্রমে দাতা সেজে একই গ্রামের বিমল হালদারের কাছে ৭৮ শতাংশ,ধ্রুব মল্লিকের কাছে ৫২ শতাংশ ও পুণ্য ঘটকের কাছে ১৩ শতাংশ সম্পত্তি বিক্রয় করে চিরতরে তার সত্য বিলুপ্ত করে আত্মসাৎ করেন।
এবিষয়ে শ্যামল জয়ধরের কাছে আপনারা কয় ভাই? জানতে চাওয়া হলে তিনি -তারা তিন ভাই ছাড়া অন্য ভাইয়ের নাম বলতে পারেন না।এরপর ওয়ারিশ সনদে ৪ ভাইয়ের নাম উল্লেখ করা আছে কিন্তু এর মধ্যে আপনার বড় ভাই সুনীল জয়ধর মারা গেছে বলে যে ওয়ারিশ সনদ দিয়ে তিন ভাইয়ের নামে তার সব সম্পত্তি নিয়ে নিলেন এটা কেমন করে সম্ভব হল? জানতে চাইলে তিনি বলেন সে তো এ দেশে নেই। তিনি জীবিত আছেন এবং বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন আমাদের সাথে কথা হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে শ্যামল জয়ধর বলেন তাকে নিয়ে আসেন।পুনরায় তার কাছে জানতে চাওয়া হয় যে ?আপনার ভাই সুনীল জয়ধর যে তারিখে মারা গেছে বলে উল্লেখ করেছেন,তার মৃত্যু সনদ আপনার কাছে আছে এ কথার পর শ্যামল জয়ধর তার ভাই সুনীল জয়ধরের মৃত্যুর পক্ষে কোন প্রমান উপস্থাপন করতে পারেননি।
যাকে মৃত্যু বলে প্রচার করা হচ্ছে সেই সুনীল জয়ধরের whatsapp নাম্বারে কল করা হলে তিনি বলেন আমার নাম সুনীল জয়ধর বাবার নাম শচীন্দ্রনাথ জয়ধর,আমি আপনাকে চিনিনা এতোটুকই।আমি বেঁচে আছি না,হলে আপনার সাথে কথা বল্লাম কি ভাবে।
ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বিপুল হালদার বলেন তিন ভাইয়ের ওয়ারিশ সনদটি আমার সুপারিশকৃত নয়।কারণ সুনীল জয়ধররা ৪ ভাই সবাই জীবিত,সুনীল জয়ধর মারা যাওয়ার কোন খবর আমার জানা নেই। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রামশীল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শ্যামল কান্তি বিশ্বাস বলেন খাগবাড়ী গ্রামের সচিন্দ্রনাথ জয়ধরের ৪ ছেলে মর্মে একটি ওয়ারিশ সনদ প্রদান করা হয়েছিল।
যে ইউনিয়ন ভুমি অফিস থেকে নামজারির প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল।সেই বান্ধাবাড়ী ইউনিয়ন ভুমি সহকারী কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন —-বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে বলতে পারবো এ নামজারিটি কি ভাবে হল।
এর আগে কোটালীপাড়া সাব রেজিস্টার অফিসের মহুরি রিপন ফকির গত ২৪ আগষ্ট একই গ্রামের জিতেন্দ্র নাথ হালদারের জীবিত পাঁচ পুত্রের মধ্যে সদানন্দ হালদার ও পঙ্কজ হালদারকে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দ্বারা মৃত দেখিয়ে অপর ভাই জগদীশ হালদার,রেনুপদ হালদার ও পলাশ হালদারের নামে একটি নামজারি করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর। উপজেলা নির্বাহী অফিসার অবৈধ ভাবে করা ওই নামজারি খতিয়ানটি বাতিল করে আদেশ দেন।
Leave a Reply