কামরুল হাসান, কোটালীপাড়া : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মাদ্রাসার ওয়াশরুমের জানালা, পানির লাইনের পাইপ, ড্রেন, সেফটি ট্যাংকি ও বারান্দার জানালা আটকে দোকানঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
সড়কের পাশের জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে নির্মিত পাঁচটি দোকানঘরের কারণে মাদ্রাসার স্বাভাবিক পরিবেশ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ কর্তৃপক্ষের।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। একই সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও দোকান নির্মাণকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিরোধ।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কুশলা বাজার এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি ব্যবসায়ী চক্র সড়কের পাশের জায়গা গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে রাতের আঁধারে সেখানে পাঁচটি দোকানঘর নির্মাণ করেছে। তবে জায়গাটির মালিকানা নিয়েই দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা জায়গাটি জেলা প্রশাসনের বলে জানতেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, জেলা পরিষদ তাদের নিয়ম মেনেই জায়গা বন্দোবস্ত দিয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—জায়গাটি যদি জেলা প্রশাসনের হয়ে থাকে, তাহলে জেলা পরিষদ কীভাবে তা বন্দোবস্ত দিল? আর জেলা পরিষদের হয়ে থাকলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কেন সেটিকে জেলা প্রশাসনের জায়গা হিসেবে জানত?
স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকানঘরগুলো নির্মাণের ফলে শুধু মাদ্রাসার অবকাঠামোই বাধাগ্রস্ত হয়নি, সড়কের পাশের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুশলা নেছারিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার নতুন ভবনের পশ্চিম পাশে এবং এলজিইডির সড়কের পূর্ব পাশে অল্প জায়গার মধ্যে পাঁচটি দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকানের কারণে মাদ্রাসার ওয়াশরুম ও বারান্দার জানালা, পানির লাইনের পাইপ, ড্রেন ও সেফটি ট্যাংকির অংশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বাকের হোসাইন বলেন, “মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত। এখানে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। ভবন সংকটের কারণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের আগে ভবন ও সড়কের পাশে মাদ্রাসার দুটি এবং ব্যবসায়ীদের তিনটি দোকান ছিল। ভবন নির্মাণের সময় দোকানগুলো অপসারণ করা হয়।”
তিনি বলেন, “ভবন নির্মাণ শেষে জায়গাটি আরও সংকুচিত হয়ে যায়। সড়ক ও ভবনের মাঝখানে যে জায়গাটুকু ছিল, আমরা সেটিকে জেলা প্রশাসনের জায়গা বলে জানতাম। কিন্তু হঠাৎ করে দেখি পাঁচ ব্যক্তি জেলা পরিষদ থেকে ওই জায়গা নিজেদের নামে বন্দোবস্ত নিয়ে রাতের আঁধারে পাঁচটি দোকানঘর নির্মাণ করেছেন।”
অধ্যক্ষ আরও বলেন, “দোকানঘর নির্মাণ করতে গিয়ে মাদ্রাসার টয়লেট ও বারান্দার জানালা, পানির লাইনের পাইপ, ড্রেন ও সেফটি ট্যাংকিসহ বিভিন্ন স্থাপনা আটকে দেওয়া হয়েছে। এখন লোডশেডিং হলে টয়লেটের ভেতরে অন্ধকার হয়ে যায়। পানির লাইনের পাইপ আটকে যাওয়ায় পানি তোলাও বন্ধ হয়ে আছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই সমস্যায় পড়েছেন।”
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহার্য সুবিধাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে জায়গা বন্দোবস্ত দেওয়া হলে তা শিক্ষা পরিবেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাদের দাবি, জায়গাটি বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে পরিমাপ ও মাদ্রাসার স্থাপনার অবস্থান যাচাই করা উচিত ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা আটকে দিয়ে দোকান নির্মাণের জন্য জায়গা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে—এটি কীভাবে সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জেলা পরিষদ যদি জায়গাটি বন্দোবস্ত দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের মালিকানা ও বন্দোবস্ত দেওয়ার এখতিয়ার কী ছিল, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
তিনি আরও বলেন, “এলজিইডির সড়কের পিচের পর সোল্ডার ও সড়কের ঢাল থাকে। সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে পথচারী ও যানবাহনের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আসে। তাই দোকানগুলো সড়কের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।”
তবে দোকান বরাদ্দ পাওয়া ব্যবসায়ী বুদ্ধিমত্ত বলেন, তিনি আগে থেকেই সেখানে ব্যবসা করতেন। তিনি বলেন, “আমি এখানে আগে থেকেই ব্যবসা করতাম। তখন উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়ম অনুযায়ী বাৎসরিক টাকা দিতাম। তখন জায়গাটি জেলা প্রশাসনের বলে জানতাম। মাদ্রাসার নতুন ভবন নির্মাণের সময় ভবনের স্বার্থে দোকান অন্যত্র সরিয়ে নিই।”
তার ভাষ্য, “তখন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ভবন নির্মাণ শেষ হলে আবার দোকান স্থাপনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। পরে ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জানতে পারি জায়গাটি জেলা পরিষদের। এরপর জেলা পরিষদে আবেদন করে জায়গা বন্দোবস্ত নিই। আমি যেখানে আগে দোকান করতাম, সেখান থেকে সরিয়ে অন্য পাশে জায়গা দেওয়া হয়েছে। তবে আগের তুলনায় জায়গার পরিমাণ কম দেওয়া হয়েছে।”
বুদ্ধিমত্তের অভিযোগ, যারা আগে সেখানে ব্যবসা করতেন না, তাদের কয়েকজনও প্রভাব খাটিয়ে জায়গা পেয়েছেন। ফলে বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দোবস্ত পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কুশলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, স্থানীয় বিএনপি নেতা ফারুক হোসেনের এক আত্মীয় ও ড্রেজার ব্যবসায়ী মিলন ফকিরও রয়েছেন।
এই তিন ব্যক্তি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে জায়গা বন্দোবস্ত নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন বলে অভিযোগও করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
এ বিষয়ে কুশলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমান বলেন, “১৬ ব্যক্তি জায়গা নেওয়ার জন্য জেলা পরিষদে আবেদন করেছিলেন। সেখান থেকে আমাদের পাঁচজনকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। বন্দোবস্ত পাওয়ার পর আমরা বৈধভাবেই দোকানঘর তুলেছি।”
মাদ্রাসার স্থাপনা আটকে দোকান নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, “জেলা পরিষদ আমাদের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। আমরা ওই জায়গায় ঘর তুলেছি। এতে অন্য প্রতিষ্ঠানের কোনো স্থাপনা আটকে গেলে আমাদের করার কিছু নেই।”
এদিকে দোকান নির্মাণের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও।
দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, “একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জানালা, পানির লাইন ও অন্যান্য স্থাপনা আটকে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এতে আমরা সমস্যায় পড়ছি। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা আটকে কীভাবে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হলো, সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। দ্রুত দোকান অপসারণ ও জায়গার বন্দোবস্ত বাতিল না হলে আমরা আন্দোলনে যাব।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষয়টি এখন আর শুধু মাদ্রাসা ও ব্যবসায়ীদের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরকারি জমির মালিকানা, বন্দোবস্তের বৈধতা, সড়কের নিরাপত্তা এবং মাদ্রাসার স্বাভাবিক পরিবেশের বিষয়ও জড়িয়ে পড়েছে।
তাদের প্রশ্ন, জায়গাটি জেলা প্রশাসনের হলে জেলা পরিষদ কীভাবে বন্দোবস্ত দিল? আর জেলা পরিষদের হলে জায়গাটির মালিকানা নিয়ে এতদিন কেন বিভ্রান্তি ছিল?
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, পাঁচটি দোকানের জন্য জায়গা বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সরেজমিনে জায়গাটি পরিমাপ করেছিল? মাদ্রাসার ভবন, জানালা, পানির লাইন, ড্রেন ও সেফটি ট্যাংকির অবস্থান কি যাচাই করা হয়েছিল? এলজিইডির সড়কের সীমানা ও নিরাপত্তার বিষয়টি কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?
গত ৫ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফ রফিকউজ্জামান। তিনি বন্দোবস্ত নেওয়া ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, “জায়গাটি কাগজে-কলমে জেলা প্রশাসনের রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই জমি জেলা পরিষদের—এমনটিও শুনেছি। বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে ভবনের স্থাপনা আটকে দোকান নির্মাণ করা দুঃখজনক।”
তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। আশা করছি সুন্দর একটি সমাধান হবে।”
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর দাবি, সড়কে চলাচলরক পথচারী ও ভবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দোকানের বন্দোবস্ত করে নির্মিত দোকানঘর অপসারণ করা জরুরী প্রয়োজন।
Leave a Reply