কে এম সাইফুর রহমান, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জ জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় মাদক নির্মূলে জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স আবারো নিজেদের অবস্থান সাফ জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন।
রোববার (৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১ টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ “স্বচ্ছতা’য় আয়োজিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরিফ-উজ -জামান সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি গোপালগঞ্জকে মাদক ও ইভটিজিং মুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।
এর আগে মাসিক সভার শুরুতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রেজওয়ানা কবির গত মাসের মাসিক সভায় গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে উপস্থিত কমিটির সকল সদস্যদেরকে অবহিত করেন।
পরে মুক্ত আলোচনায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি’র নবগঠিত আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব মোঃ ফজলুল কবির দারা জেলায় মাদকের বিস্তার রোধে প্রয়োজনে পূর্বে বিভিন্ন মাদক মামলায় জড়িতদেরকে বিশেষ কোন আইনে কারাগারে প্রেরণের প্রস্তাব রাখেন, কেননা মাদক ব্যবসায়ীরা খুবই চতুরতার সাথে এ ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছে। যদিও বা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহ পুলিশ সহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারীদেরকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই ব্যবসা পরিচালনা করছে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত ও সুস্থ জাতি গঠনে বাঁধা গ্রস্থ হতে চলেছে। এছাড়াও তিনি বলেন, বছরের এই সময়টিতে হঠাৎ বেওয়ারিশ কুকুরের পাদুর্ভাব ও তাদের আক্রমণের শিকার থেকে শিশু-বাচ্চা সহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের যানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক, জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোঃ তৌফিকুল ইসলাম মাদক নির্মূলের পাশাপাশি গরু চুরি ঠেকাতে জেলার সকল উপজেলায় পুলিশি টহল আরো জোরদার করার আহ্বান জানান।
জেলা জামায়াতে ইসলামের আমির অধ্যক্ষ এম এম রেজাউল করিম জেলা পরিষদের মূল্যবান সরকারি জায়গা প্রশাসনের সঠিক তদারকির অভাবে ধীরে ধীরে কতিপয় অসাধুচক্রের দখলে চলে যাচ্ছে, তা প্রতিহত করার অনুরোধ জানান। এছাড়াও তিনি পৌরসভা কর্তৃক সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যা ঘোলাটে ও দুর্গন্ধযুক্ত এবং বড় বাজারের আশপাশের সড়কে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো লোড- আনলোড করায় সর্বত্র যানজট লেগেই থাকে বিশেষ করে মাছ পট্টি সহ আশপাশের এলাকায়। একজন ক্রেতা বাজারে গিয়ে সুষ্ঠু ও নিরাপদভাবে বাজার সদাই করার নিশ্চয়তা প্রদানে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।
গোপালগঞ্জ শহরকে যানজট মুক্ত করতে জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম মওদুদ হোসেন রিন্টু গোপালগঞ্জ শহরকে যানজট মুক্ত করার আহ্বান জানান।
মানবাধিকার ও গণমাধ্যমকর্মী কে এম সাইফুর রহমান নতুন অর্থবছরে পৌর এলাকার ব্যবহার অনুপযোগী প্রায় ৯০ শতাংশ সড়ক দ্রুত মেরামতের আহ্বান জানান এছাড়াও গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন জায়গায় অসাধু বালু ব্যবসায়ীরা বোরিং করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।
এ সময় জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আবু সাঈদ মোঃ ফারুক বলেন, মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক কুকুরকে নিধন করা যাবে না, তবে সকলেই সাবধানে চলাচল করবেন। কুকুরের কামড়ে কেউ যদি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হন তাহলে তার মৃত্যু নিশ্চিত বিশ্বের কোথাও এখন পর্যন্ত এ রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পৌর সভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম রকিবুল ইসলাম সকলকে জানান, বছরের এই সময়ে পাট জাগ দেওয়ার কারণে পৌরসভা থেকে সরবরাহকৃত পানি অনেকটা ঘোলাটে ও কিছুটা দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান হবে এবং প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সদর উপজেলার চরমানিকদাহ পানির প্লান্টের কাজ পরিপূর্ণভাবে মেরামত হলে আগামী বছর থেকে এ সমস্যা আর থাকবে না বলেও জানান তিনি।
গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা শরিফ রফিকুজ্জামান মুক্ত আলোচনায় বলেন, অচিরেই জেলা পরিষদের বিভিন্ন বেদখল হওয়া জমি দখল মুক্ত করে সরকারি রাজস্ব আয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও তিনি গোপালগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে টেকেরহাট- গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া আঞ্চলিক সড়ক প্রশস্তিকরণ প্রকল্পের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সড়কের মান নিয়ে আক্ষেপ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সড়কের মান যাচাইয়ের অনুরোধ জানান।
জেলা পুলিশ সুপার মোঃ হাবীবুল্লাহ মুক্ত আলোচনায় বলেন, জেলা পুলিশ মাদক নির্মূলে সর্বদাই জিরো টলারেন্স। মাদক নির্মূল প্রশ্নে যদি কোন পুলিশ সদস্য তার নাম সামনে আসে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এছাড়া জেলায় সম্প্রতি একাধিক ধর্ষণ মামলায় বিচারিক আদালত কর্তৃক সরাসরি এফ.আর.আই- এর নির্দেশে জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উপস্থিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি মহোদয়কে ধর্ষণ মামলায় ন্যায় বিচারের স্বার্থে তদন্তপূর্বক মামলা রেকর্ডের দিকনির্দেশনা দিলে অনেক নির্দোষ লোক হয়রানির শিকার থেকে রেহাই পাবেন বলেও বিষয়টি বিবেচনা করে দেখার অনুরোধ জানান। এছাড়াও জেলা পুলিশ সুপার গর্ব করে বলেন অন্যান্য জেলার মতো গোপালগঞ্জ জেলায় রাজনৈতিক হামলা মামলা নেই বললেই চলে। তবে জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে গত মাসে ২১ জন আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এই সংকট মোকাবেলায় সকলকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরিফ- উজ -জামান জেলা শহরের দীর্ঘদিনের যানজট বিশেষ করে লঞ্চঘাট এলাকার যানজট নিরসনে তিনি টেম্পু-অটোরিক্সা সমিতির নেতৃবৃন্দের সাথে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ বিভাগ ও পৌর প্রশাসনের যৌথ সমন্বয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে অতি শীঘ্রই লঞ্চ ঘাটের পাশেই স্টেডিয়ামের ওখানে টেম্পু ও অটো স্ট্যান্ড স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিবেন বলে জানান। পরিশেষে তিনি সভায় উপস্থিত থাকার জন্য জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সকল সদস্যদেরকে ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
এ সময় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৌশিক আহমেদ, মুকসুদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদ আশিক কবির, কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাগুফতা হক, কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শাহিন মিয়া, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম ফয়জুল বারী, গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ জীবিতেষ বিশ্বাস, জেলা কমান্ড্যান্ট মোহাম্মদ টিটুল মিয়া, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ, ডিজিএফআই -এর প্রতিনিধি এসআই ফারহান, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ গোবিন্দ চন্দ্র সরদার, জেলা মৎস্য অফিসার মোঃ কামরুল ইসলাম, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অঃ দাঃ) লাখসানা লাকী, জেলা বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক মোঃ হাবিবুর রহমান, জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সৈয়দা তামান্না তাসনীম, প্রেসক্লাব গোপালগঞ্জের সভাপতি মোঃ জুবায়ের হোসেন, এনজিও কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মী রিনা বিশ্বাস সহ জেলা আইন- শৃঙ্খলা কমিটির অন্যান্য সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply