ডেস্ক রিপোর্ট : বাবার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্যাতন-নিপীড়ন আর পরিবারের দুঃসহ দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এক তরুণ। শৈশবের বঞ্চনা, বাবার কারাবাস এবং মায়ের সীমাহীন কষ্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় এ আবেগঘন বর্ণনা দেন।
কান্নায় ভেঙে পড়া ওই তরুণের নাম মো. আব্দুল্লাহ সিয়াম। তিনি বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজ ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক। তাঁর বাবা কামরুজ্জামান শিমুল বাগেরহাট সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
মো. আব্দুল্লাহ সিয়াম বলেন , মাজার জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী বের হওয়ার সময় সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন। এ সময় সিয়াম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গেলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যরা প্রথমে তাঁকে ছবি তুলতে বাধা দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে কাছে ডাকলে নিজের ও পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরেন সিয়াম।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তাঁর বাবা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁকে মারধর করে ওপর থেকে ঝুলিয়ে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে তাঁর মাথা ফেটে যায়। বাবার রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে তাঁদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনও ব্যাহত হয়েছে। ছোটবেলায় ঠিকমতো স্কুল-কলেজে যেতে পারেননি তাঁরা। বাবা গ্রেপ্তার হলে তাঁর মা দুই সন্তানকে নিয়ে বাগেরহাট আদালতে যেতেন। যাতায়াতের টাকা না থাকায় অনেক সময় পায়ে হেঁটেই আদালতে যেতে হয়েছে তাঁদের। বাবার দীর্ঘ সংগ্রাম ও পরিবারের এমন দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
এদিকে নিজের ওপর দীর্ঘদিনের নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা দিয়েছেন সিয়ামের বাবা কামরুজ্জামান শিমুল। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার তিনি শুধু গত ১৭ বছর নন, এরও অনেক আগে থেকে। ১৯৯৯ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়, যেটিকে তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় টানা নয় মাস কারাবরণ করেন তিনি। ওই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে পরপর সাতটি মামলা দায়ের করা হয় বলেও জানান তিনি।
শিমুলের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এলাকাছাড়া হয়ে ঢাকায় পালিয়ে থাকতে বাধ্য হন। সেখানেও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকায় নির্যাতনের শিকার হন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে মোট পাঁচবার কারাবরণ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিজের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কামরুজ্জামান শিমুল বলেন, বাগেরহাট গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে জেলগেট থেকে ধরে নিয়ে দুই পা ফ্যানের হুকের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট ঝুলিয়ে রাখার পর তাঁর চোখ দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। তখন এক পুলিশ সদস্য চিৎকার করে বলেন, ‘এই শিমুল তো মারা যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি ওকে খুলে দাও।’ পরে তাঁকে নামানোর সময় মেঝেতে পড়ে প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়েছিল বলে জানান তিনি। ওই সময় এক কারাবন্দি বিএনপি কর্মী তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে পানি পান করিয়েছিলেন।
২০১৮ সালের একটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, সে বছর তাঁকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তা তাঁর বক্তব্য শোনার পর তাঁকে ছেড়ে দেন। কিন্তু থানা গেটের সামনে পৌঁছালে বাগেরহাট সদর থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক আজিজুর রহমান তাঁকে আবার আটক করেন। তখন তাঁর নামে কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
শিমুলের অভিযোগ, থানায় নেওয়ার পর তাঁর দুই হাত ও দুই পায়ে হাতকড়া পরিয়ে একটি লাঠির মাধ্যমে হাত-পায়ের বাঁধন একসঙ্গে আটকে রাখা হয়। এরপর চার থেকে পাঁচজন পুলিশ সদস্য তাঁকে বেধড়ক মারধর করেন। তাঁর দাবি, বেত দিয়ে পায়ের তলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত দুই হাজার আঘাত করা হয়েছিল। নির্যাতনে তাঁর পিঠের চামড়া উঠে যায় এবং বসার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে পরদিন রিমান্ডে নিয়ে আরও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিজের ওপর নির্যাতনের প্রভাব তুলে ধরে কামরুজ্জামান শিমুল বলেন, তিনি একা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হননি; তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে পুরো পরিবারকে কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে।
মাজার প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিয়ামের এই কথোপকথনের দৃশ্য উপস্থিত অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাবার দীর্ঘ সংগ্রাম ও পরিবারের বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে এক সন্তানের কান্না সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
Leave a Reply